ঢাকাTuesday , 30 September 2025
  1. অপরাধ
  2. অর্থনীতি
  3. আইন আদালত
  4. আন্তর্জাতিক
  5. আবহাওয়া
  6. কৃষি বার্তা
  7. খেলাধুলা
  8. খোলা কলাম
  9. গনমাধ্যাম
  10. চাকরি
  11. জাতীয়
  12. তথ্যপ্রযুক্তি
  13. দৈনন্দিন আইন
  14. ধর্ম
  15. নির্বাচন
আজকের সর্বশেষ সবখবর

জুবিন গার্গ: ভক্তের ঈশ্বর হয়ে ওঠা এক কিংবদন্তি

Nadigram
September 30, 2025 2:55 pm
Link Copied!

আসলাম উদ্দিন, সাংবাদিক।

আসামের আকাশ আজও বেদনায় ভারী। ভারতীয় সঙ্গীতজগতের এক অনন্য নক্ষত্র জুবিন গার্গের বিদায় যেনো শুধুই একজন শিল্পীর মৃত্যু নয়—এটি একটি প্রজন্মের আবেগ, ভালোবাসা ও মানবতার প্রতীক হারানোর ব্যথা। ৫২ বছরের জীবনে তিনি যেভাবে মানুষের হৃদয়ে নিজের জায়গা করে নিয়েছিলেন, মৃত্যুর পরও তেমনি জনসমুদ্র তৈরি হলো তাঁর শেষযাত্রায়। প্রায় ১৭ লাখ মানুষের অংশগ্রহণ শুধু ‘অ্যাঙ্গারা বয়’ বা ‘রকস্টার অফ আসাম’-এর জনপ্রিয়তাই নয়, প্রমাণ করলো—মানুষ্যত্বই আসল ধর্ম।

জুবিন গার্গ বলিউডে তাঁর “ইয়া আলি” বা “দিল তু হি বাতা”–এর মতো গানের জন্য আন্তর্জাতিক খ্যাতি পেয়েছিলেন। কিন্তু আভিজাত্যের মুম্বাই তাঁকে টানেনি। পাহাড়, নদী, সবুজ আর মানুষের টানে তিনি থেকে গেছেন নিজের মাটিতে। বহু সাক্ষাৎকারে বলেছেন—“রাজা কখনো নিজের রাজ্য ছেড়ে যায় না।” তাই তাঁর শেষকৃত্যও হয়েছে নিজের হাতে লাগানো চন্দন গাছের কাঠ দিয়ে, নিজ মাটির বুকে।

জুবিন গার্গের জন্ম ১৮ নভেম্বর ১৯৭২ সালে, আসামের তেজপুরে। তার বাবা নীলুতপল গার্গ ছিলেন একজন সাহিত্যিক ও নাট্যকার এবং মা ইলোমনি গার্গও ছিলেন সংস্কৃতিমনা। পরিবারের পরিবেশেই তিনি ছোটবেলা থেকে গান, অভিনয় ও বাদ্যযন্ত্রের সঙ্গে পরিচিত হন। অল্প বয়সেই তিনি বাঁশি, তবলা, গিটারসহ একাধিক বাদ্যযন্ত্রে দক্ষতা অর্জন করেন। কিশোর বয়সে মঞ্চে গান গাওয়ার মাধ্যমে শুরু হয় তার শিল্পীজীবনের প্রথম ধাপ। মৃত্যর আগ পর্যন্ত প্রায় ৪০টি ভাষায় তিনি প্রায় ৪০ হাজার গান করেন।

তাঁর জীবন কেবল গানেই সীমাবদ্ধ ছিল না। গাছ লাগানো থেকে এতিম শিশুদের আশ্রয় দেওয়া, গণধর্ষণের শিকার কিশোরীকে উদ্ধার করা, মুসলিম এতিম শিশুদের জন্য মাদ্রাসা খোলা—সবকিছুর মধ্যেই ছিলেন মানবিক ‘জুবিন’। নিজের বাড়ি কোভিডকালে ‘কোয়ারেন্টাইন সেন্টার’ বানানো কিংবা রাজনীতির ভয় না পেয়ে নাগরিকপঞ্জি (এনআরসি)–র বিরুদ্ধে প্রতিবাদ—সবকিছুই প্রমাণ করে, তিনি কেবল শিল্পী ছিলেন না; ছিলেন মানুষের বন্ধু, আশ্রয়দাতা, কণ্ঠহীনদের কণ্ঠ।

তাঁর গানও ছিল মানুষের জীবন থেকে নেওয়া। বিরহ, বেদনা, ভালোবাসা আর নস্টালজিয়ার মিশেলে তিনি এপার–ওপার বাংলার মধ্যবিত্ত ঘরে ঘরে ঢুকে পড়েন। টলিউডের প্রেম, রোমান্স, ব্যথার দৃশ্যের আড়ালে যে কণ্ঠ বেজে উঠতো—তা ছিল জুবিনেরই। আর সেই কণ্ঠ যেনো এখনো শোনা যাচ্ছে ‘মায়াবিনী রাতির বুকুত’-এর সুরে, যা তাঁর শেষ ইচ্ছানুযায়ী মৃত্যুর পর চারদিকে বাজছে।

তার কণ্ঠ ও সৃষ্টির জন্য তিনি বহুবার জাতীয় ও আঞ্চলিক পুরস্কার পেয়েছেন। অসমীয় সঙ্গীতে অবদানের জন্য তিনি সর্বাধিক সম্মানিত শিল্পীদের একজন। বলিউডে তার গানও একাধিকবার মিউজিক চার্টের শীর্ষে অবস্থান করেছে।

তার দর্শন ছিল—
“মোর কোনো জাতি নাই, মোর কোনো ভগবান নাই, মই মুক্ত, মই কাঞ্চনজঙ্ঘা।” কিন্তু যে মানুষ বলতেন তার কোনো জাতি বা ভগবান নেই, সেই মানুষটাই জীবন্ত ঈশ্বর হয়ে উঠেছিলেন কোটি মানুষের কাছে। তিনি লক্ষ লক্ষ মানুষকে পথে নামাতে পেরেছিলেন, কাঁদাতে পেরেছিলেন, জাগাতে পেরেছিলেন। এমন ক্ষমতা হাজার বছরে একবার কারো মধ্যে জন্মায়।

জুবিন গার্গকে মানুষ মাথায় তুলে রেখেছিল। কারণ, তিনি মানুষকে মাথায় স্থান দিয়েছিলেন। খাইয়ে দিলে খেতেন, মাথায় হাত রাখলে কেঁদে উঠতেন, পাইস হোটেলে বসে সাধারণ মানুষের মতো খেতে দ্বিধা করতেন না। তাঁর কাছে ক্যারিয়ারের কিছু গান বাদ যাওয়া আফসোস ছিল না; জীবনের ভালোবাসার মুহূর্ত বাদ যাওয়াই তাঁকে ব্যথিত করতো।

একজন তারকার জীবনে যেমন আলো থাকে, তেমনি ছায়াও আসে। জুবিন গার্গও তার ব্যতিক্রম নন। কখনো বক্তব্য, কখনো ব্যক্তিজীবনের সিদ্ধান্ত তাকে বিতর্কে ফেলেছে। তবে প্রতিবারই তিনি গান ও মানবিকতার শক্তিতে ভক্তদের আস্থা ফিরিয়ে এনেছেন। এটাই তার জনপ্রিয়তার অন্যতম রহস্য।

জীবনের আসল সফলতা হলো মানুষের ভালোবাসা। শেষ দিনে আমাদের মৃতদেহের পাশে কতগুলো মুখ জড়ো হলো, কতটি চোখ ভিজলো, কতজন শেষ দেখা না পেয়ে হা-হুতাশ করলো—সেইটুকুই আমাদের প্রকৃত সঞ্চয়। জুবিন গার্গ সেই সঞ্চয়ের অনন্য উদাহরণ। বিশ্বের চতুর্থ বৃহত্তম শেষযাত্রার মিছিল, তিন দিনের রাষ্ট্রীয় শোক, বন্ধ স্কুল-কলেজ—সব প্রমাণ করে তিনি শুধু একজন শিল্পী নন, ছিলেন মানবিক শিল্পী।

জুবিন গার্গ কেবল একজন শিল্পী নন—তিনি এক ইতিহাস, এক অনুপ্রেরণা, এক অমর নাম। তিনি চলে গিয়েও থেকে যাবেন আমাদের হৃদয়ে, আমাদের কণ্ঠে, আমাদের ভালোবাসায়।

এই সাইটে নিজম্ব নিউজ তৈরির পাশাপাশি বিভিন্ন নিউজ সাইট থেকে খবর সংগ্রহ করে সংশ্লিষ্ট সূত্রসহ প্রকাশ করে থাকি। তাই কোন খবর নিয়ে আপত্তি বা অভিযোগ থাকলে সংশ্লিষ্ট নিউজ সাইটের কর্তৃপক্ষের সাথে যোগাযোগ করার অনুরোধ রইলো।বিনা অনুমতিতে এই সাইটের সংবাদ, আলোকচিত্র অডিও ও ভিডিও ব্যবহার করা বেআইনি।